রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬ | সময়: বিকেল ৫:৩৮

টাকা চুরির অপবাদ দিয়ে যুবককে অমানুষিক নির্যাতন ডিবি পুলিশের

পিরোজপুর ডিবি পুলিশের সদস্যদের বিরুদ্ধে নির্মম নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন পুলিশ কর্মকর্তাদের মেসে অস্থায়ীভাবে কেয়ারটেকার হিসেবে কাজ করা মো. ইউনুস ফকির (৪০) নামে এক যুবক। জেলা ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরিফুল ইসলামের টাকা চুরির অভিযোগে তাকে নির্যাতন করা হয় বলে জানা গেছে। যদিও পরবর্তীতে অন্য আরেক কর্মীর কাছ থেকে চুরি হওয়া টাকা উদ্ধার হয়।
গত সোমবার (১৩ এপ্রিল) দুপুরে নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেও বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) রাতে বিষয়টি জানাজানি হয়।
এ ঘটনায় অভিযুক্ত জেলা ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরিফুল ইসলামকে ক্লোজ করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। নির্যাতনের বিষয়টি পুলিশ মহলে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
ভুক্তভোগী ইউনুস ফকির পিরোজপুর সদর উপজেলার খানাকুনিয়ারি গ্রামের মৃত মোবারেক আলী ফকিরের ছেলে। তিনি জানান, পিরোজপুর পুলিশ লাইনসের রাস্তায় প্রবেশের মুখে পুলিশ কর্মকর্তাদের থাকার জন্য নির্মিত মেসে তিনি কেয়ারটেকার হিসেবে কাজ করছেন। ২০০৮ সালে ভবনটি নির্মাণের সময় তিনি ওখানে যুক্ত হন। পরবর্তীতে মেসে অবস্থানকারীরা প্রতিমাসে তাকে কিছু টাকা দেন। ভবনটির দ্বিতীয় তলায় একটি কক্ষে থাকেন পিরোজপুর ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আরিফুল ইসলাম। তার কক্ষের দুইটি চাবির মধ্যে একটি ইউনুসের কাছে ছিল।
তিনি জানান, সোমবার দুপুর দেড়টার দিকে আরিফ হঠাৎ করেই ইউনুসের কাছে থাকা চাবিটি ফেরত চান। তবে সেটি দিতে ব্যর্থ হন ইউনুস। এরপরই আরিফ তাকে জানান, তার কক্ষ থেকে এক লাখ ৮০ হাজার টাকা চুরি হয়েছে ও ইউনুসই সেই টাকা নিয়েছে। টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য তাকে চাপ দেন।
ইউনুস টাকা চুরির কথা অস্বীকার করার পর তাকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে ভবনের নিচতলায় নিয়ে যান ও মারধর শুরু করেন। পরবর্তীতে ডিবি পুলিশের আরও ৭-৮ জন সদস্য সেখানে গিয়ে ইউনুসকে নির্মমভাবে মারধর শুরু করে। তাকে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন। এছাড়া তিনি চিৎকার করলে তার মুখে লাঠি দিয়ে শব্দ বন্ধ করে রাখা হয়।
ইউনুস জানান, যেহেতু তার কাছে একটি চাবি ছিল তাই তিনি ওই টাকা পরিশোধ করবেন। এরপর ডিবি পুলিশের সদস্যরা তাকে তার গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যান। পরিবারের সদস্যরা টাকা দিতে রাত পর্যন্ত সময় চান। পরবর্তীতে মেসে নিয়ে আবারও ইউনুসকে নির্যাতন করা হয়। একপর্যায়ের আরিফের ঘনিষ্ঠ ডিবি পুলিশ সদস্য কাওসারের নেতৃত্বে ৩-৪ জন তাকে জোর করে রান্না ঘরে নিয়ে যান। এরপর তার পুরুষাঙ্গে মোমবাতি গলিয়ে আধাঘণ্টা ফেলতে থাকে। এ ঘটনার পর পরিবারের সদস্যরা আরিফকে টাকা পৌঁছে দেন।
পরবর্তীতে ইউনুসকে পিরোজপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনজুর আহমেদ সিদ্দিকীর কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তিনি ইউনুসের কাছ থেকে বিস্তারিত শোনার পর ওই মেসে কাজ করা ঝাড়ুদার শাকিলকে ডেকে পাঠান। পরবর্তীতে জিজ্ঞাসাবাদে শাকিল টাকা চুরির কথা স্বীকার করেন ও পুলিশ সেই টাকা উদ্ধার করে। এরপর ইউনুসের পরিবার প্রথমে যে টাকা দিয়েছিল সেগুলো তাকে ফেরত দেওয়া হয়।
জানা যায়, আহত ইউনুস চিকিৎসার জন্য পিরোজপুর সদর হাসপাতালে যেতে চাইলে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির তাকে পিরোজপুর শহরের একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে চিকিৎসা দেন। বিষয়টি জানাজানি হবে এই আশঙ্কায় চিকিৎসকের কাছে ইউনুসের সমস্যার বিষয়ে কিছুই বলতে দেননি হুমায়ুন।
পরবর্তীতে একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নির্দেশে পরের দিন ডিবি পুলিশ ইউনুসকে খুলনার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেয়। সেখানেও ইউনুসকে বলতে বাধ্য করে যে, স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া করে তিনি নিজেই নিজের পুরুষাঙ্গ পুড়িয়েছে। এছাড়া তিনি পড়ে গিয়ে ব্যথা পেয়েছেন।
এ ঘটনার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন ইউনুস। এছাড়া পুলিশের সঙ্গে পেরে উঠবে না এই আশঙ্কায় তারা কোথাও কোনো অভিযোগ দেননি।
বিষয়টির সুষ্ঠু বিচারের জন্য পুলিশ সুপার আশ্বাস দিয়েছে বলে জানান ইউনুস। এছাড়া তাকে একটি কর্মসংস্থানের আশ্বাস দিয়ে বিষয়টি চেপে যাওয়ার জন্য ডিবি পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।
ইউনুস ও তার পরিবারের দাবি, কর্মসংস্থানের পরিবর্তে নির্মম এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার করা হোক। ইউনুসের ভাই আনিসুর রহমান বলেন, একজন খুনিকেও এভাবে নির্যাতন করা হয় না, যেভাবে আমার ভাইকে নির্মম নির্যাতন করা হয়েছে। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।
অভিযোগের বিষয়ে জেলা ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরিফুল ইসলামের সঙ্গে কথা হলে তিনি ছুটিতে আছেন বলে জানান ও এ বিষয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।
এ বিষয়ে পিরোজপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মজনুর আহম্মেদ সিদ্দিকি মুঠোফোনে বলেন, ঘটনাটি সম্পর্কে আমি বিস্তারিত জেনেছি। ভুক্তভোগীর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তার সঙ্গে অমানুষিক অত্যাচারের সত্যতা মিলেছে। এ বিষয়ে অভিযুক্ত আরিফুল ইসলামকে ক্লোজ করা হয়েছে। তদন্তের জন্য অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) জিয়াউর রহমানকে দায়িত্ব দিয়ে এক সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদনের পরে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মো. তরিকুল ইসলাম/এমএন/এমএস

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সম্পর্কিত পোস্ট