ভারতীয় সংগীতজগতের কিংবদন্তি গায়িকা আশা ভোঁসলে আর নেই। মুম্বাইয়ের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ ১২ এপ্রিল দুপুরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তার মৃত্যুতে পুরো উপমহাদেশের সংগীতাঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোক।
আশা ভোঁসলে ছিলেন সেই সোনালি প্রজন্মের শেষ প্রতিনিধি, যাদের কণ্ঠে গড়ে উঠেছিল হিন্দি চলচ্চিত্র সংগীতের স্বর্ণযুগ। তার সঙ্গে একই সময়ের কিংবদন্তিদের মধ্যে ছিলেন বড় বোন লতা মঙ্গেশকর, পাশাপাশি ছিলেন মুকেশ, মোহাম্মদ রফি ও কিশোর কুমার- যারা কয়েক দশক ধরে ভারতীয় সংগীতকে শাসন করেছেন।
মাত্র ৯ বছর বয়সে ১৯৪৩ সালে গানের জগতে যাত্রা শুরু করেন আশা ভোঁসলে। সেই সময় তার বড় বোন লতা মঙ্গেশকর সংগীত জগতে নিজের অবস্থান তৈরি করতে শুরু করেছেন। ফলে ক্যারিয়ারের শুরুতে আশাকে বারবার ‘লতার ছোট বোন’ পরিচয়ে পরিচিত হতে হয়েছে। তবে প্রতিভা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে ধীরে ধীরে নিজস্ব পরিচয় গড়ে তোলেন তিনি। হয়েছেন নিজেই এক মহাতারকা।
ভারতীয় সংগীতের দুই কিংবদন্তি বোন লতা মঙ্গেশকর ও আশা ভোঁসলের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা কখনোই শেষ হয় না। কেউ বলেন প্রতিযোগিতা, কেউ বলেন দূরত্ব। অনেকে দাবি করতেন দুই বোনের মধ্যে ক্যারিয়ার নিয়ে চাপা দ্বন্দ্বও ছিলো। তবে তাদের জীবনের ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক গভীর ভালোবাসা, ত্যাগ আর নির্ভরতার গল্প।
লতা মঙ্গেশকরের শৈশবেই ঘটেছিল এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা যা বদলে দেয় তার জীবনের পথ। ছোট বোন আশা ভোঁসলেকে ছাড়া তিনি কোথাও যেতে চাইতেন না। এমনকি স্কুলেও ছোট বোনকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন। কিন্তু স্কুল কর্তৃপক্ষ সেই নিয়ম ভেঙে দিতে অস্বীকৃতি জানায়। বলা হয়, বোনকে নিয়ে স্কুলে আসা চলবে না।
সেই মুহূর্তেই মাত্র ছোট বয়সে বড় বোন লতা মঙ্গেশকর সিদ্ধান্ত নেন তিনি আর স্কুলে ফিরবেন না। সেই এক সিদ্ধান্তই তাকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে নিয়ে গেলেও পরে তিনি নিজের চেষ্টায় নিজেকে গড়ে তোলেন এক অনন্য উচ্চতায়। সংগীতজগতে তিনি হয়ে ওঠেন এক অমর নাম।
অন্যদিকে, ছোট বোন আশা সবসময়ই দিদিকে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয় হিসেবে দেখেছেন। যদিও দুজনের ব্যক্তিত্ব ছিল একেবারেই ভিন্ন। লতা ছিলেন শান্ত, সংযত; আর আশা ছিলেন খোলামেলা ও স্পষ্টভাষী।
একবার এক ঘরোয়া অনুষ্ঠানে একটি মন্তব্য নিয়ে আশা ভোঁসলে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। কিন্তু সামনে দিদি বসে আছেন বলে তিনি রাগ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। ঠিক তখনই লতা মঙ্গেশকর কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে শুধু বলেন, ‘আশা, যা বলতে চাও বলে ফেলো। নইলে তোমার খাবার হজম হবে না।’ দিদির এই অনুমতি পেয়ে সেদিন নিজের কথা প্রকাশ করেন আশা।
দিদিকে অনুসরণও করতেন আশা নিজের আদর্শ হিসেবে। নতুনদের সুযোগ করে দিতে ১৯৬৯ সালের পর ফিল্ম ফেয়ার অ্যাওয়ার্ড থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন লতা মঙ্গেশকর। লতা নতুনদের ইন্ডাস্ট্রিতে প্রতিষ্ঠিত হতে সহায়তা তো করেনই না, বরং সুযোগ পেলে তাদের পথে কাঁটা বিছিয়ে দেন- নিন্দুকদের এমন অপপ্রচারের জবাব দিতেই নিয়েছিলেন এ উদ্যোগ। ১০ বছর পর মঙ্গেশকর পরিবারের আরেক মেয়ে আশা ভোঁসলের কাছ থেকেও আসে একই ঘোষণা। ১৯৭৯ সালে সপ্তমবারের মতো পুরস্কৃত হবার পর আশাও জানিয়ে দেন নতুনদের উঠে আসার পথ আরো সুগম করতে তিনিও সরে দাঁড়াচ্ছেন ফিল্ম ফেয়ার অ্যাওয়ার্ড থেকে। সেই ঘোষণায় খুব খুশি হয়েছিলেন লতা।
লতা-আশার ব্যক্তিগত রেষারেষি নিয়ে মুখরোচক গল্প থাকলেও তারা কখনোই তা স্বীকার করেননি। এক সাক্ষাৎকারে আশা বলেছিলেন, মানুষ আমাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করত, কিন্তু রক্ত সব সময় পানির চেয়েও ঘন। অনেক সময় অনুষ্ঠানে কেউ কেউ লতা দিদিকে তোষামোদ করতে আমাকে এড়িয়ে চলতেন। পরে দিদি আর আমি এসব নিয়ে হাসাহাসি করতাম।
দুই বোনের এই সম্পর্ক নিয়ে বহুবার গুঞ্জন উঠেছে প্রতিযোগিতা ও দূরত্বের। তবে ঘনিষ্ঠদের মতে, সবকিছুর ঊর্ধ্বে ছিল তাদের রক্তের বন্ধন। লতা মঙ্গেশকর ছিলেন শুধু বড় বোনই নন, অনেকটা মায়ের মতো ছায়া হয়ে ছিলেন আশার জীবনে।
আজ এই দুই কিংবদন্তির গল্প শুধু সংগীত ইতিহাস নয়, বরং আত্মত্যাগ, ভালোবাসা আর সম্পর্কের এক অনন্য অধ্যায় হিসেবে বেঁচে আছে মানুষের হৃদয়ে।
এলআইএ







