রবিবার, ১১ জানুয়ারি ২০২৬ | সময়: সকাল ৭:১৬

খামের ভেতরেই কী লুকিয়ে নির্বাচনের ভাগ্য?

Daraz horizontal banner

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে নীরবে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে এমন এক শক্তিশালী উপাদান হয়ে উঠেছে পোস্টাল ভোট। নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে প্রায় ১৫ লাখ পোস্টাল ব্যালট ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে ৭ লাখেরও বেশি ভোট প্রবাসী বাংলাদেশিদের, যা নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি খামের ভেতরে থাকা একটি ব্যালট পেপারই বদলে দিতে পারে একটি আসনের ভাগ্য-এমনকি পুরো নির্বাচনের চিত্রও। বিশেষ করে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আসনগুলোতে পোস্টাল ভোট হয়ে উঠতে পারে প্রকৃত অর্থেই একটি ‘গেম চেঞ্জার’। ফলে এই ভোটপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বাড়ছে আলোচনা ও উদ্বেগ।
স্বপ্নের ভোটাধিকার, বাস্তবের জটিলতা
বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য দেশের বাইরে বসে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক অগ্রগতি। তবে বাস্তবে পোস্টাল ব্যালট সংগ্রহ, প্রেরণ ও গ্রহণের প্রতিটি ধাপেই রয়েছে নানা জটিলতা ও ঝুঁকি। সময়মতো ব্যালট না পৌঁছানো, ঠিকানাগত বিভ্রান্তি কিংবা মধ্যবর্তী পর্যায়ে অনিয়মের আশঙ্কা ইতোমধ্যেই আলোচনায় এসেছে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, বিপুলসংখ্যক এই ব্যালট যেন কোনোভাবেই ‘অদৃশ্য হাতের’ কবলে না পড়ে। পোস্টাল ভোটের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে নির্বাচনের সামগ্রিক গ্রহণযোগ্যতাও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। তাই নির্বাচন কমিশনের প্রতি জোরালো দাবি উঠেছে-পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থাপনায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা, কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার।
মালয়েশিয়ায় প্রবাসীদের ভোগান্তির বাস্তব অভিজ্ঞতা
পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের অভিজ্ঞতায়। সম্প্রতি পোস্টাল ব্যালট প্রাপ্তিতে চরম ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন প্রযুক্তি পেশাজীবী ও ইয়ুথ হাব মালয়েশিয়ার সহ-প্রতিষ্ঠাতা পাভেল সারওয়ার।
তিনি জানান, প্রবাস থেকে দেশের যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাওয়াটা ছিল আনন্দের। কিন্তু মালয়েশিয়ার পোস্টাল সার্ভিস Pos Laju-এর ট্র্যাকিং জটিলতায় সেই আনন্দ দ্রুত হতাশায় রূপ নেয়। অ্যাপে তার ব্যালট পেপারটি ‘ডেলিভার্ড’ দেখালেও বাস্তবে তিনি তা পাননি। এমনকি কোনো ফোনকল বা নোটিশও দেওয়া হয়নি।
পরে কুয়ালালামপুরে Pos Laju-এর প্রধান কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে কর্তৃপক্ষ জানায়, তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি বলে পার্সেলটি ‘রিটার্ন’ করা হয়েছে। তবে পাভেল সারওয়ারের দাবি, তাকে কোনো কলই করা হয়নি। সেখানে গিয়ে তিনি লক্ষ্য করেন, একই অভিযোগ নিয়ে আরও চার-পাঁচজন বাংলাদেশি প্রবাসী উপস্থিত ছিলেন।
নিরাপত্তা ও যাচাই নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন
নিজের অভিজ্ঞতা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুলে ধরে পাভেল সারওয়ার বলেন, একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে ভোট দেওয়া আমার অধিকার। কিন্তু পোস্টাল সার্ভিসের এমন গাফিলতি দেখে আমি হতাশ। আমি নিজে অফিসে গিয়ে ব্যালট সংগ্রহ না করলে আমার ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকত না।
তিনি পোস্টাল ব্যালটের নিরাপত্তা নিয়েও গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার ভাষায়, আরেকটি বড় কনসার্ন হলো-আপনার ট্র্যাকিং নম্বর জানা থাকলে অন্য যে কেউ খুব সহজেই আপনার ব্যালট সংগ্রহ করতে পারে। Pos Laju অফিসে কোনো আইডি ভেরিফিকেশন ছাড়াই শুধু নাম ও পাসপোর্ট নম্বর লিখে সাইন করলেই পার্সেল দেওয়া হচ্ছে। এতে কার পার্সেল কে নিচ্ছে, তা কীভাবে যাচাই করা হচ্ছে?
একই অভিজ্ঞতা অন্য প্রবাসীরও
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশি এক্সপ্যাটস ইন মালয়েশিয়া (বিডিএক্সপ্যাটস) এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ মুশফিকুর রহমান রিয়াজ। তিনি জানান, এখনো তার ব্যালট হাতে পৌঁছায়নি। পোস্ট অফিসে যোগাযোগ করলে তাকে জানানো হয়, তাকে না পেয়ে ব্যালট পেপার বাংলাদেশে রিটার্ন পাঠানো হয়েছে।
রিয়াজ বলেন, যেখানে আমার ফোন নম্বর ছিল, সেখানে ডেলিভারির সময় একটি ফোনকল করলেই সমস্যা সমাধান হতো। কিন্তু তা না করে ব্যালট পেপার ফেরত পাঠানো হয়েছে।
প্রবাসীদের সতর্কতা ও দূতাবাসের ভূমিকার আহ্বান
মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের উদ্দেশে পাভেল সারওয়ার পরামর্শ দেন, শুধু অ্যাপের ট্র্যাকিংয়ের ওপর নির্ভর না করে Pos Laju-এর ওয়েবসাইটে নিয়মিত ট্র্যাকিং নম্বর যাচাই করতে। কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে কলের অপেক্ষা না করে দ্রুত নিকটস্থ পোস্ট অফিসে যোগাযোগ করার আহ্বান জানান তিনি, যেন ব্যালট বাংলাদেশে ফেরত যাওয়ার আগেই সংগ্রহ করা যায়।
সচেতন মহলের মতে, পোস্টাল ব্যালট প্রক্রিয়াকে কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য করতে প্রবাসীদের ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোর আরও সক্রিয় ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি। নিয়মিত তথ্য প্রদান, স্পষ্ট দিকনির্দেশনা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা না বাড়ালে এই গুরুত্বপূর্ণ ভোট প্রক্রিয়া ভবিষ্যতে বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।
সব মিলিয়ে, ১৫ লাখ পোস্টাল ভোট শুধু একটি সংখ্যা নয়-এটি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের এক নীরব শক্তি। এই শক্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে, নাকি নতুন প্রশ্ন ও বিতর্কের জন্ম দেবে-তা নির্ভর করছে পুরো প্রক্রিয়ার সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থাপনার ওপর।
এমআরএম/এমএস

Daraz horizontal banner
Daraz square banner
technoviable
technoviable

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সম্পর্কিত পোস্ট